মারুফ কবীর :
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত যশোর। বর্তমানে সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে দাঁড়িয়েছে ‘কোচিং বাণিজ্য’। কোচিং বাণিজ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা রীতিমত জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা সব স্তরেই এখন কোচিং নির্ভরতা তুঙ্গে। আইন ও নীতিমালার তোয়াক্কা না করে জেলাজুড়ে গড়ে উঠেছে শত শত কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট ও স্পেশাল ব্যাচ। কোচিং হয়ে উঠেছে রীতিমত বাণিজ্যিক পেশা। কোচিং বাণিজ্যের এই আগ্রাসন বন্ধ না হলে সাধারণ পরিবারের জন্য শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়বে এবং পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই নৈতিক সংকটে পড়বে।
সরেজমিনে যশোর শহরের কোর্ট মোড়, জিরো পয়েন্ট, পৌরসভার সামনে, চুয়াডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ড এলাকা, এমএম কলেজ এলাকা, উপশহর, পালবাড়ি, খাজুরা বাসস্ট্যান্ড, ঘোপ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাণিজ্যিক ভবন থেকে শুরু করে আবাসিক বাসা ভাড়া করে দেদারছে চলছে কোচিং নামে ব্যবসা। এসব প্রতিষ্ঠানের কোন কোনটিতে কর্পোরেট অফিসের আদলে রিসিপশনিস্ট থেকে শুরু করে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ। রয়েছে নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। সেই সাথে সকল প্রকার ডিজিটাল টেকনোলজি। নামিদামি সরকারি/বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করে এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। এবং তাদের শিক্ষার্থীদের নিজ কোচিং সেন্টারে পড়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়লে পরীক্ষার খাতায় নম্বর কমিয়ে দেয়া হয়। সাধারণ পাঠ্যবইয়ের বাইরে ‘স্পেশাল শিট’ ও ‘সাজেশন’ দেয়ার নামে শিক্ষার্থীদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শতভাগ চান্স পাওয়ানোর নিশ্চয়তা দিয়ে বাহারি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অভিভাবকদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এ অবস্থায় কোচিং অভিভাবকদের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। অভিভাবকদের অভিমত, সন্তানের ভালো ফলাফলের আশায় প্রতি মাসে শুধুমাত্র কোচিং ও প্রাইভেট বাবদ ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। নিয়মিত টিউশন ফি দেয়ার পর এই অতিরিক্ত খরচ মেটাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষা এখন সেবার বদলে পুরোদস্তুর ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকার ২০১২ সালে ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা’ জারি করে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে সতর্কবার্তা দেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। নীতিমালায় নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও যশোরে তা মানা হচ্ছে না। অনেক শিক্ষক নিজের বাসায় বা গোপন স্থানে ব্যাচ করে শত শত শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন। কেউ কেউ নিজ স্কুলের অব্যবহৃত কক্ষেও কোচিং পরিচালনা করে থাকেন। এতে প্রকৃত মেধাবীদের ফলাফল বিপর্যয় হচ্ছে। প্রশাসনের নজরদারি না থাকা এবং কঠোর শাস্তির অভাবকে এই পরিস্থিতির ব্যবপকতার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা। মুক্তা ইয়াসমিন নামে এক অভিভাবক বলেন, বিদ্যালয়ে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করলে কোচিং প্রয়োজন পড়ে না। তাই কোচিং বাণিজ্যে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা জরুরি। তা না হলে একদিন হয়তো আমাদের মত মধ্যবিত্তের সন্তানরা অর্থের অভাবে বঞ্চিত হবে শিক্ষা থেকে।
যশোরে আসন্ন পঞ্চম শ্রেণীর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে কোচিং বাণিজ্য ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন। ক্লাসের নিয়মিত পাঠদান কমিয়ে শিক্ষকদের নিজ পরিচালিত বা পছন্দের কোচিং সেন্টারে পড়তে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হচ্ছে। সাজেশন বা শিট থেকে শতভাগ কমন পড়ার দাবি তুলে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা।
এছাড়া, এইচএসসি শেষে উচ্চশিক্ষার ভর্তি যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দেশে শত শত কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। যশোরের রয়েছে এসব কোচিং সেন্টারের শাখা। এসব কোচিংয়ে উচ্চ ফি ও প্যাকেজ আকারে নেয়া হচ্ছে ১৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এমনকি ভুয়া চান্স পাওয়ার চটকদার বিজ্ঞাপনে শিক্ষার্থীদের ছবি ব্যবহার করছে একাধিক কোচিং সেন্টার। প্যাকেজের বাইরেও শিট ও বুক বাণিজ্য, যেমন-নিজস্ব গাইড, প্র্যাকটিস বুক ও মডেল টেস্ট প্যাক কিনে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এতে অভিভাবকরা আর্থিক ও মানসিকভাবে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। অতিরিক্ত কোচিং ও প্রাইভেট ফি দিতে গিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
এদিকে, সদ্যঘোষিত এসএসসির ফলাফলের পর থেকেই বিভিন্ন কোচিং সেন্টার থেকে ম্যাসেজ ও ফোন করে অভিভাবকদের তার সন্তানকে তাদের কোচিং সেন্টারের ভর্তির জন্য বলা হচ্ছে। অবশ্য এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এসএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকেই। কোন কোন কোচিং সেন্টার বলছে তাদের ইতিমধ্যে ৫ম ব্যাচ, চতুর্থ ব্যাচ বা দ্বিতীয় ব্যাচে ভর্তি শেষ হয়েছে বলেও জানানো হচ্ছে। ইবনে হোসেন নামে একজন অভিভাবক বলেন, প্রায় দিনই এসব কোচিং সেন্টারের একাধিক মেসেজ ও ফোন রিসিভ করতে হয়। এমন অবস্থায় সন্তানকে নিয়ে থাকতে হয় দ্বিধাদ্বন্দ্বে কোন কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীকে ভর্তি করবেন বা কোন বিষয়ে কোন কোচিং সেন্টার ভাল হবে। আর খরচই বা কত হবে।
যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) খান মাসুম বিল্লাহ এ প্রতিবেদককে বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে কোচিংয়ের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমার বন্ধ করে দিলেও অন্য স্থানে অন্য নামে আবারও কোচিং পরিচালিত করছে অসাধু কোচিংয়ের নামে ব্যবসায়ীরা। রীতিমত তারা চোর-পুলিশ খেলা খেলছে। তিনি আরও বলেন, জেলাজুড়ে অবৈধ কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও পরিদর্শন জোরদার করা হবে। অবৈধ কোচিংয়ের বিষয়ে তথ্য থাকলে প্রশাসনকে জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা। কোচিং বাণিজ্য বন্ধের সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলে জানান তিনি।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মাহফুজুল হোসেন বলেন, কোচিং বাণিজ্য রোধে জেলায় একটি কমিটি আছে। কমিটির কাজ চলমান আছে। আমাদের কাছে অবৈধ কোচিংয়ের ব্যাপারে তথ্য দিনে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। শিক্ষার আলো সবার জন্য সহজলভ্য করতে এবং কোচিংয়ের দৌরাত্ম্য রুখতে সবার সম্মিলিত সহযোগিতা একান্ত কাম্য।
শিক্ষাবিদ সোলজার রহমান বলেন, কোচিং বাণিজ্য বন্ধের বিষয়ে সরকারি যে প্রজ্ঞাপন সেটিতে বলা হয়েছে, পরীক্ষার সময় কোচিং বন্ধ রাখতে হবে। এ প্রজ্ঞাপনে ফাঁক থেকে যাচ্ছে। পরীক্ষার সময় বাদে অন্য সময়ে কোচিং করানো যাবে বলে আশকারা দেয়া হচ্ছে। অভিভাবকদের প্রতি আহবান করে তিনি বলেন, সন্তানদের অতিরিক্ত কোচিং নির্ভর না করে তাদের স্বনির্ভর পাঠাভ্যাসে উৎসাহিত করুন। তিনি আরও বলেন, শ্রেণিকক্ষেই পাঠদান সম্পূর্ণ করতে হবে। অনৈতিক কোচিং বাণিজ্যে যুক্ত থাকলে এমপিও বাতিলসহ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে অভিমত দেন তিনি।
