বাংলার ভোর ডেস্ক :
নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকা সত্বেও কোনো রাজনৈতিক কাঠামোর শৃঙ্খলে নিজেকে আবদ্ধ না রাখা একজন বড় কবির নিদর্শন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাড. রুহুল কবির রিজভী।
এ সময় তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের উদাহরণ টেনে বলেন, কবি নজরুল কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম হয়েও সরাসরি দলের সদস্য হননি; একইভাবে কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন একটি রাজনৈতিক বিশ্বাস ধারণ করলেও নিজেকে কোনো দলীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, যা একজন বড় মাপের কবির অন্যতম বড় পরিচয়। তার সব জায়গায় সমর্থন থাকবে, কিন্তু তিনি মুক্ত বিহঙ্গের মতো থাকবেন।
শনিবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন হলে ‘সারেঙ’ সাহিত্য পত্রিকার রেজাউদ্দিন স্টালিন সংখ্যার প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
কবি স্টালিনকে একজন আধুনিক ও ব্যতিক্রমী স্রষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, তার কবিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বরা ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অস্ট্রেলিয়াতে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং এশিয়ার প্রথম নোবেল লরিয়েট হিসেবে পরিচিত করার কারিগর শিবনারায়ণ রায় একটি অস্ট্রেলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া বক্তব্যে স্টালিনের কবিতার উপর আলোচনা ও প্রবন্ধ লিখেছেন।
এছাড়া দেশের অগ্রগণ্য ও খ্যাতনামা সাহিত্য বিশ্লেষক অধ্যাপক ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ডক্টর আবুল কাসেমসহ অসংখ্য গুণীজন তার কবিতার অসাধারণ মূল্যায়ন করেছেন। তাই এটি কোনো ছোটখাট বিষয় নয়, অন্য কবিরা তাকে যথার্থই ‘কবিদের কবি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক নিপীড়নের কথা স্মরণ করে রিজভী বলেন, সেই কঠিন সময়ে মামলা ও কারাবরণের আশঙ্কায় অনেক নিকটাত্মীয় ও বন্ধুবান্ধব তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাবার সাহস পেত না। কিন্তু সেই দুঃসময়েও কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন সাহসের সঙ্গে আমাদের পাশে ছিলেন, খোঁজখবর রেখেছিলেন।
রাজনীতিবিদ ও কবিদের সহ্যশক্তির পার্থক্য তুলে ধরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, রাজনীতিবিদদের যেমন সমালোচনা ও গালাগালি সহ্য করার অফুরন্ত সহ্যগুণ (টলারেন্স) থাকতে হয়, তেমনি কবিরা সাধারণত অত্যন্ত আত্ম-অভিমানী হন, কেউ কিছু বললে চট করে অভিমান বা রাগ করে সরে দাঁড়ান, না পারলে কাব্যের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান।
তবে স্টালিনকে আপাতদৃষ্টিতে এগ্রেসিভ মনে হলেও তার ভেতরটা খাঁটি কবিহৃদয়। এমনকি তার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমসাময়িক বিরোধী কবিও স্বীকার করেছেন যে, স্টালিনের ‘সমগ্র সত্তাটাই কাব্য এবং গোটা সত্তাটাই কবি’। পেশাগত বা সাহিত্যিক প্রতিযোগিতা থাকলেও সেই কবি তার খাঁটি কবিসত্তা নিয়ে সত্য উচ্চারণ করেছেন।
সমসাময়িক বৈশ্বিক সংকটগুলো সাহিত্যে তুলে আনার ওপর জোর দিয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবী আজ গভীর সংকটের মুখে। প্রতিটি দেশ এই সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছে। সমকালীন সংকট ও মানুষের জীবনকে কবিতায় তুলে ধরার মধ্য দিয়ে কবিরা তাদের সময়কে ধারণ করেন।
এসব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় যদি কবিতায় উঠে না আসে, তবে তা পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে তিনি কবি স্টালিনের লেখা ‘একদিন বৃক্ষের জন্য সবাইকে কাঁদতে হবে’ পঙ্ক্তিটির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, এটি সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিবেশ সংকটের এক অসাধারণ ও সত্য প্রতিচ্ছবি। সমকালীনতা ও বৈশ্বিক সংকট কবিতায় ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমেই বড় কবি হয়ে উঠেছেন তিনি।
দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ইতিবাচক পরিবর্তন প্রসঙ্গে অ্যাড. রিজভী বলেন, সম্প্রতি একজন অর্থনীতিবিদের অনুষ্ঠানে সরকারের ইতিবাচক- নেতিবাচক দিক আলোচনার পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছিল।
এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, উপযুক্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকলে সেটি কতটা কর্মময় ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে, নিজ দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে যার প্রমাণ রেখেছেন রেজাউদ্দিন স্টালিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হান, মুক্তচিন্তা বাংলাদেশের আহ্বায়ক আবুল কাসেম হায়দার এবং কবি ও সাংবাদিক শাহীন চৌধুরী।
‘সারেঙ’ সম্পাদক আবদুর রহমান মল্লিকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও অংশ নেন কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ, কবি কামরুজ্জামান, কবি সৈকত হাবিব, কবি আসাদ কাজল এবং ছড়াকার ও এটিএন বাংলার প্রধান নির্বাহী (বার্তা) হাসান শরীফ।
প্রসঙ্গত গত জুনে প্রকাশিত ‘সারেঙ’ এর বিশেষ সংখ্যাটি কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের বর্ণাঢ্য জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে সাজানো হয়েছে।
